দেশে বর্তমানে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজার ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের। বাংলাদেশ এগ্রো প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতের রফতানি আয় ৩৯৮ মিলিয়ন ডলার। তবে এর ৬০ শতাংশ এসেছে মাত্র পাঁচটি দেশ থেকে। বাকি ৪০ শতাংশ অবদান ১০১টি দেশের। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বাজার দিন দিন বড় হচ্ছে। গুটিকয়েক দেশের ওপর রফতানিনির্ভরতা এ খাতের জন্য বড় ঝুঁকি।
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল কৃষি প্রক্রিয়াজাত শিল্প সম্পর্কে গণমাধ্যমকর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এক কর্মশালার আয়োজন করে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। এ সময় গবেষক ও খাতসংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে এ তথ্য উঠে আসে। কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
বাপার তথ্য বলছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ১০৬টি দেশে ২ লাখ ৩ হাজার ৬৯১ টন প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি হয়েছে। এর মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে। এ পাঁচ দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি থেকে আয় হয়েছে ২৩৯ দশমিক ৬ মিলিয়ন ডলার। এছাড়া মালয়েশিয়ায় প্রায় ১৯ মিলিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ওমানে ১৭ মিলিয়ন ডলারের খাদ্যপণ্য রফতানি হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ থেকে ভ্যালু অ্যাডেড পণ্য তৈরি ও রফতানি হচ্ছে না। ফলে বৈশ্বিক বাজারে জায়গা তৈরি করা যায়নি। এছাড়া রফতানি আয় ক্রমান্বয়ে বাড়লেও এসব পণ্যের ক্রেতা মূলত প্রবাসী বাংলাদেশীরাই।
কর্মশালায় সিপিডির গবেষণা পরিচালক গোলাম মোয়াজ্জেম জানান, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের বাজারের আকার ৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের, যা ২০৩০ সালের মধ্যে আরো ১ বিলিয়ন ডলার বাড়তে পারে। দেশে প্যাকেটজাত খাদ্যপণ্যের বাজারমূল্য ৭ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। জিডিপিতে কৃষি প্রক্রিয়াজাত পণ্যের অবদান ১ দশমিক ৭ শতাংশ। খাদ্য প্রক্রিয়াজাতের সঙ্গে হাজারখানেক প্রতিষ্ঠান যুক্ত। যাদের ৯০ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা। এছাড়া সর্বোচ্চ ২৫০ প্রতিষ্ঠান রফতানিমুখী খাদ্যপণ্য উৎপাদন করে থাকে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ মূলত কম মূল্যের খাদ্যপণ্য রফতানি করে থাকে, এর লক্ষ্য নির্দিষ্ট একটি শ্রেণী। ফলে বৃহৎ বাজারে প্রবেশ করা যায়নি। যেসব দেশে প্রবাসী বাংলাদেশীর বসবাস বেশি সেসব দেশে পণ্য বেশি রফতানি হয়। অর্থাৎ বিদেশেও বেশির ভাগ ক্রেতা বাংলাদেশী। এ কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় রফতানি বেশি।’
গোলাম মোয়াজ্জেম আরো বলেন, এ খাতে বিনিয়োগ বাড়লে পোশাক শিল্পের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি শিল্প হতে পারে। এজন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি পর্যায়ে উদ্যোগ নিতে হবে। এতে দেশের কৃষি খাত ও কৃষকরা উপকৃত হবে। তবে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য রফতানি আয়ের ৬০ শতাংশ আসে পাঁচ দেশ থেকে, যা এ খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।’
কর্মশালায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য ও খাদ্যপণ্যের বর্তমান প্রেক্ষাপট, সম্ভাবনা এবং চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘এ শিল্পের যত অগ্রগতি হবে, দেশের কৃষি খাত তত উপকৃত হবে। যদিও বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব কৃষিজ পণ্য উৎপাদন হয় তার মাত্র ১৩ শতাংশের মতো প্রক্রিয়াজাতযোগ্য। এর মধ্যে সবগুলো নিরাপদও নয়। মূলত অতিরিক্ত কীটনাশক ও সার ব্যবহার এবং পানিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতির কারণে উৎপাদিত পণ্য অনিরাপদ থেকে যাচ্ছে। এছাড়া কৃষকরা যথাযথ প্রক্রিয়ায় পণ্য সংরক্ষণ করতে পারেন না কিংবা সেই সক্ষমতা নেই। এতে অনেক সময় পণ্যের গুণাগুণ নষ্ট হয়। সেজন্য কৃষক পর্যায় থেকে উৎপাদিত সব পণ্য রফতানির জন্য প্রক্রিয়াজাত করা যায় না।’
এ খাতের চ্যালেঞ্জগুলো উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে একটি শিল্পের নিবন্ধন পেতে ৪২টি ডকুমেন্টস জমা দিতে হয়। অনুমোদন নিতে বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হয়। এভাবে দিনের পর দিন কেটে যায়। ব্যাংকের ঋণের সুদ ১৫ শতাংশ পর্যন্ত দিতে হয়। বিএসটিআই মাত্র ৩১৫টি পণ্যের সার্টিফিকেশন দেয়, যা আবার আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রহণ করে না। বাকি পণ্যের সার্টিফিকেশনের জন্য অন্য দেশে যেতে হয়। এমন অনেক চ্যালেঞ্জই রয়েছে।’
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের এ কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রে সব খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে মাত্র একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কাজ করে। অথচ বাংলাদেশে ১৮টি প্রতিষ্ঠান নজরদারি করে। কিন্তু কারো সঙ্গে কারো সমন্বয় নেই। এতগুলো প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীন নজরদারি অনেক সময় হয়রানি হয়ে দাঁড়ায়।’